২০২৪ সালের মে মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে গত মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে।
দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে চলতি বছরের মার্চে। ওই মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩২৯ কোটি বা ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। এর আগে কখনই এক মাসে এত পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসেনি। এক মাসে এত রেমিট্যান্স দেশে আসার ক্ষেত্রে রমজান মাস ও ঈদুল ফিতরের ভূমিকা ছিল। তবে এপ্রিলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। এবার মে মাসে আবারো রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছল।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের মে মাসে ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এবার মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ উৎসব জুনের ৭ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সে হিসাবে ঈদ উপলক্ষে আসা বেশির ভাগ রেমিট্যান্স জুনে আসবে। তা সত্ত্বেও মে মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, সেটি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান তথা গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় প্রবৃদ্ধি লক্ষ্ করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ২৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরে প্রবাসীরা ৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার বেশি পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিদ্যমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হলে চলতি বছর রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনন্য উচ্চতায় পৌঁছবে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিদেশে হুন্ডির চাহিদা তৈরি হয় দেশ থেকে। বাংলাদেশীদের পাচারকৃত অর্থের বড় অংশ বিদেশে প্রধান শ্রমবাজারগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ থেকে টাকা পাচারের পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে। এ কারণে বিদেশে হুন্ডি কারবারিদের চাহিদাও কমে গেছে। কালোবাজারে চাহিদা কমলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে রেমিট্যান্স প্রবাহে যে উল্লম্ফন আমরা দেখছি, সেটি তারই প্রভাব।’
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, ‘রেমিট্যান্সের বিদ্যমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর হতে হবে। টাকা পাচার বন্ধ হলে হুন্ডির তৎপরতাও কমে যাবে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরো বেশি উৎসাহিত হবেন। আর যে প্রবাসীরা অর্থনীতিতে এত বড় ভূমিকা রাখছেন, তাদের জন্যও সরকারের দিক থেকে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে ২০২০-২১ অর্থবছরে। করোনাভাইরাস-সৃষ্ট দুর্যোগের ওই বছরে প্রবাসীরা রেকর্ড ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে ২১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বেড়ে ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তা হবে দেশে রেমিট্যান্স আসার নতুন রেকর্ড।
এদিকে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। গতকাল ১ জুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) দেশের রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এদিন গ্রস রিজার্ভ ২৫ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছিল।